
| Headline : |
|
শৈশবে পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ্যবই থেকে মুখস্থ করেছিলাম কবির ‘আযান’ কবিতাটি
লেখক:- Roushan Hasan, USA। শিক্ষাতথ্য ডটকম।।
|
|
শিক্ষাতথ্য, ঢাকা (০৩ জুলাই,
২০২১) :-
প্রকৃত নাম সৈয়দ কাজেম আলী আল কোরাইশী, মহাকবি কায়কোবাদ যিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি, মহাকাব্য মহাশ্মশানের রচয়িতা। ১৮৫৭ সালের ২৫শে মার্চ ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা গ্রামে মহাকবি কায়কোবাদের জন্ম । বাবা শাহামতউল্লাহ আল কোরাইশী ছিলেন ঢাকা জেলা জজ কোর্টের একজন বিচারপতি ।শৈশবেই কবিতার প্রতি অনুরাগবোধ থেকে তিনি কাব্য রচনা শুরু করেন । মাত্র তেরো বছর বয়সে ১৮৭০ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিরহবিলাপ’ প্রকাশিত হয় l শৈশবে পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ্যবই থেকে মুখস্থ করেছিলাম কবির ‘আযান’ কবিতাটি : কে ওই শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি। মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী। কি মধুর আযানের ধ্বনি! আমি তো পাগল হয়ে সে মধুর তানে, কি যে এক আকর্ষণে, ছুটে যাই মুগ্ধমনে কি নিশীথে, কি দিবসে মসজিদের পানে। হৃদয়ের তারে তারে, প্রাণের শোণিত-ধারে, কি যে এক ঢেউ উঠে ভক্তির তুফানে- কত সুধা আছে সেই মধুর আযানে। নদী ও পাখির গানে তারই প্রতিধ্বনি। ভ্রমরের গুণ-গানে সেই সুর আসে কান কি এক আবেশে মুগ্ধ নিখিল ধরণী। ভূধরে, সাগরে জলে নির্ঝরণী কলকলে, আমি যেন শুনি সেই আযানের ধ্বনি। আহা যবে সেই সুর সুমধুর স্বরে, ভাসে দূরে সায়াহ্নের নিথর অম্বরে, প্রাণ করে আনচান, কি মধুর সে আযান, তারি প্রতিধ্বনি শুনি আত্মার ভিতরে। নীরব নিঝুম ধরা, বিশ্বে যেন সবই মরা, এতটুকু শব্দ যবে নাহি কোন স্থানে, মুয়াযযিন উচ্চৈঃস্বরে দাঁড়ায়ে মিনার ‘পরে কি সুধা ছড়িয়ে দেয় উষার আযানে! জাগাইতে মোহমুদ্ধ মানব সন্তানে। আহা কি মধুর ওই আযানের ধ্বনি। মর্মে মর্মে সেই সুর বাজিল কি সমধুর আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী। ১৯৩২ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলন-এর প্রধান অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল এই কবি কায়কোবাদ । প্রকাশিত অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে কুসুম কানন (১৮৭৩), অশ্রুমালা (১৮৯৫), মহাশ্মশান (১৯০৪), শিব-মন্দির (১৯২২), অমিয়ধারা (১৯২৩), শ্মশান-ভস্ম (১৯২৪) ও মহরম শরীফ (১৯৩২) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্ম । তাঁর মৃত্যুর বহুদিন পর প্রকাশিত হয় প্রেমের ফুল (১৯৭০), প্রেমের বাণী (১৯৭০), প্রেম-পারিজাত (১৯৭০), মন্দাকিনী-ধারা (১৯৭১) ও প্রেমের কুঞ্জ (১৯৭৯)। (১৯৯৪-৯৭ সালে) চার খণ্ডের কায়কোবাদ রচনাবলী প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। মুসলমান কবিদের মধ্যে একমাত্র কায়কোবাদই মহাকাব্য মহাশ্মশান রচনা করেছিলেন। এই কাব্যই তাঁকে মহাকবি খেতাবে পরিচিতি দিয়েছিল l দীর্ঘ এ কাব্য রচনায় বাংলার দুই মহাকবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কায়কোবাদ। কাব্যটি মোট তিন খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডে ঊনত্রিশ সর্গ, দ্বিতীয় খণ্ডে চব্বিশ সর্গ এবং তৃতীয় খণ্ডটি মোট সাত সর্গের। সব মিলিয়ে মোট ষাট সর্গে প্রায় নয়শ পৃষ্ঠার এই মহাকাব্যটি ১৯০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাকারে প্রকাশ হতে আরও কয়েক বছর সময় লেগেছিল। ১৭৬১ সালে সংঘঠিত পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত এ মহাকাব্যে যুদ্ধের ভয়াবহ সংঘাত, বিরুপতা, প্রণয় ও বিচ্ছিন্নতা তিনি দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন কায়কোবাদ। এ কাব্যে মোট তিনটি খন্ড রয়েছে। কাব্যের প্রারম্ভে ‘কবির বীণা ও কল্পনা’ এবং ‘আল্লাহু আকবর’ নামক বন্দনা অংশ রয়েছে । এছাড়াও ‘এব্রাহিম কার্দ্দি ও জোহরা বেগমের বাল্য জীবনের এক অধ্যায়’ শীর্ষক একটি সর্গ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে । ভারতের উদীয়মান হিন্দুশক্তি মারাঠাদের সঙ্গে যুদ্ধবৃত্তান্ত, মুসলিমশক্তি তথা আহমদ শাহ আবদালীর নেতৃত্বে রোহিলা-অধিপতি নজীবউদ্দৌলার শক্তিপরীক্ষা কাব্যের বিষয়বস্তুুতে স্থান পেয়েছে l যুদ্ধে মুসলমানদের জয় হলেও কবির দৃষ্টিতে তা ছিল উভয়েরই শক্তিক্ষয় ও ধ্বংস; একারণেই কাব্যটির নামকরণ করেছিলেন মহাশ্মশান । যুদ্ধকাহিনীর মধ্যে অনেকগুলো প্রণয়সমূহও স্থান পেয়েছে। মহাকাব্যের পতোন্মুখ এবং গীতিকবিতার স্বর্ণযুগে মহাকবি কায়কোবাদ মুসলিমদের গৌরবময় ইতিহাসের কাহিনী সম্বলিত এ মহাকাব্য রচনার যে দুঃসাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তা চিরকালের স্মরণযোগ্য l আধুনিক বাংলাসাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি কায়কোবাদকে বাংলা কাব্য সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯২৫ সালে নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ তাকে ‘কাব্যভূষণ’, ‘বিদ্যাভূষণ’ ও ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৩২ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন মহাকবি কায়কোবাদ। ১৯৫১ সালের ২১ জুলাইয়ে ৯৪ বছর বয়সে মারা যান কবি কায়কোবাদ। কবিকে সমাহিত করা হয় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে। |