
| Headline : |
|
স্মৃতিতে মহুয়া মাতাল বারহাট্টা ইস্টিশন
বার্তা প্রেরক:- আসলাম আহমাদ খান, নিউ ইয়র্ক। শিক্ষাতথ্য ডটকম।।
|
|
শিক্ষাতথ্য, ঢাকা (১০ জুন, ২০২০) :-
![]() “বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি অথচ কি আশ্চর্য , পুনর্বার চিনি দিতে এসেও রফিজ আমাকে চিনলো না” দেশবরেণ্য কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘হুলিয়া’ কবিতা এবং তানভীর মোকাম্মেলের নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ছায়াছবির কল্যাণে বারহাট্টা স্টেশনের নামটি এখন অনেকের কাছেই পরিচিত। কংস পাড়ের এই রেল স্টেশানের দক্ষিণে- পায়ে হাঁটা দুরত্বেই কবির জন্মস্থান। রাজধানী ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ জংশন , ময়মনসিংহ জংশন থেকে মোহনগন্জগামী লাইনের সাতটি স্টেশন পরেই নেত্রকোণা কোর্ট স্টেশান, সেখান থেকে দুই স্টেশন পূর্বে বারহাট্টা উপজেলা পরিষদ কার্যালয় ঘেঁষে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রেল স্টেশন। মফস্বল শহরের অন্যসব স্টেশনের মতোই ছোট্ট নিরিবিলি একটি স্টেশন- আলাদা করা কঠিন। বাহ্যিক কাঠামো মোটামুটি একই ধরণের হলেও এই স্টেশনের আছে গর্বিত ইতিহাস। অনেক মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও আবেগ জড়িয়ে আছে এই স্টেশনকে ঘিরে। ![]() বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সাক্ষী বারহাট্টার এই রেল স্টেশান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্বে ১৭ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের প্রচার সম্পাদক ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল মমিন এবং গণপরিষদ সদস্য ডা. আখলাকুল হোসেন সাহেবের নির্বাচনী প্রচারণা শেষে মোহনগন্জ থেকে ফেরার পথে এই স্টেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। বারহাট্টার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আড্ডা বসতো এই স্টেশনে। কবি নির্মলেন্দু গুণ বসতেন তার বাল্যবন্ধু রফিজের স্টলে। রফিজ ভাই নেই। দীলিপের স্টলে বসতেন প্রয়াত শিক্ষক মনসুর আহমেদ, সাহিত্যিক আব্দুল হাই খান, আব্দুর রশিদ মাধুর্য্য ,শিক্ষক গিরীন্দ্র সরকার, কবি মনোয়ার সুলতান, ডা. আব্দুল হালিম, ডা. আমজাদ হোসেন ফকির, মোস্তফা ওয়াদুদ খান’রা। যশমাধবের আনোয়ার আহমেদ খান, ইসপিন্জারপুরের বজলুল হক, তরুণ কান্তি দাস, এমদাদুল হক , হিতেন্দ্র দত্ত দুলু, নওগাঁ’র মাহবুবুর রহমান শহীদ,আব্দুস শহীদ সেজু, ছালিপুরার হাফিজুর রহমান,বারহাট্টার ২৪ ঘন্টার পরিচিত মুখ মুক্তিযাদ্ধা দশালের রহিম ভাই, সুকুমার দা, রাতে সবার শেষে বাড়ি ফেরা বরুন দা-ও বসতেন দিলীপের স্টলে। মেম্বার হওয়ার পর শহীদুর রহমান বিদ্যা মিয়াও বসতেন, জানু মেম্বারকে সাথে নিয়ে খোকন চেয়ারম্যান আসতেন রাত- বিরাতে। রাতে ফার্মেসী থেকে ফেরার পথে নারায়ণ ডাক্তার এই স্টেশান ধরেই হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরতেন। বামনগায়ের এমদাদ ভাই তো শেষ পর্যন্ত বাড়িই করেছিলেন স্টেশন সংলগ্ন। স্টলে বসে চা খাওয়ানোর জন্য একে ওকে ডাকডাকি করতেন। ব্যবসা মন্দার কারণে দিলীপ দা-ও এখন অন্য পেশায়। স্টেশনের প্রবেশমুখে রতনের স্টলের একটা টেবিলে নিয়মিত দেখা যেতো প্রয়াত আতাউর রহমান খান মোহন ও মাসুদ কামালকে। মাঝে মাঝে যোগ দিতেন মোশারফ ওবায়েদ ও সুলতান মাহমুদ মুরাদ। এই স্টলের আড্ডায় এক পর্যায়ে আমাদের বন্ধু- বান্ধবদের গ্রুপটাও যুক্ত হয়েছিলাম। বারহাট্টা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ভলিবল খেলা শেষ করে পুরো টিম সন্ধ্যার পর এখানে বসতো। মালিকানা বদল হয়ে রতনের স্টল হয়েছিল নয়নের স্টল- এখন ওখানে ডিমের আড়ৎ। পত্রিকা পড়ুয়ারা বসতো সন্তোষের লন্ড্রির সামনের বেঞ্চে। রাতে বাড়ি না ফেরা রাজনৈতিক কর্মীরা অল্প খরচে খেয়ে নিতো নায়েব আলীর হোটেলে, তার মৃত্যুর পর ভাতের হোটেল বন্ধ করে ছেলেরা চলে গেছে অন্য জেলায়। জমজমাট আড্ডা হতো স্টেশনের সামনের কালভার্টের উপরেও। মোহনগন্জ কলেজ থেকে ফেরার পর বৈকালিক আড্ডায় কালভার্টটা থাকতো আমাদের দখলে; মোফাজ্জলকে ছাড়া তো আড্ডাই জমতো না। যুবক তরুণদের পাশাপাশি সিনিয়রদেরও আড্ডা হতো এই স্টেশনে। তুলনামূলকভাবে সিনিয়র রাজনীতিবিদ ও যাত্রাগান বিলাসী শ্রদ্ধেয় আজিজুর রহমান, কবিগানের জন্য সমাদৃত সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনীতিবিদ প্রয়াত আছাব উদ্দিন খান, শৌখিন যাত্রা শিল্পী, ‘জবার বাপ খ্যাত’ এক সময়ের সাড়া জাগানো অভিনেতা প্রয়াত আলী হোসেন ভূঁইয়া, বারহাট্টা ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক সময়ের অপরিহার্য মুখ নূরুল ইসলাম শেখ (শান্ত মিয়া) রাতে স্টেশন মাস্টারের রুমে বসতেন চায়ের আড্ডায়। মুক্তিযাদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী মরহুম সূলতান আহমেদ নূরীও মাঝে মধ্যে বসতেন দিলীপের স্টলে। কাদের বাহিনীর সদস্য হিসেবে পুলিশের হাতে এ্যারেস্ট হওয়ার পর সে সংবাদ প্রচার ঢালাও করে প্রচার হয়েছিল রেডিওতে। বারহাট্টা থানা থেকে কোর্টে চালান দেয়ার পথে ইস্পাত কঠিন এক সাহসী মানুষকে দেখেছিলাম বারহাট্টা স্টেশনের রেনট্রীর নীচে। একই গ্রামে বাড়ি হওয়ার সুবাদে আম্মা উনাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। একজন মুক্তিযাদ্ধার মা হিসেবে উনিও আম্মাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেন। যেদিন এ্যারেস্ট করে স্টেশনে নিয়ে এসেছে, শুনে- আম্মা আমাকে উৎসাহ দিয়ে স্টেশনে পাঠিয়েছিলেন উনাকে দেখে আসার জন্য এবং অভয় দিয়ে কি বলতে হবে তা ও বলে দিয়েছিলেন। স্টেশনে গিয়ে পুলিশের ভয়ে কথাটি বলতে পারিনি। তবে উনি আমাকে দেখে কাছে ডেকে নিয়ে, মাথায় হাত দিয়ে আদর করেছিলেন। এক সময় শিল্পী সাহিত্যকদের আড্ডার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বারহাট্টা ইস্টিশন। এই স্টেশনের মানুষের জীবন কাহিনী নিয়ে মনোয়ার সুলতান লিখেছিলেন এক সময়ের সাড়া জাগানো নাটক “ বিলাসপুরের ফুলবানু”। বারহাট্টাতে তখন কোন অডিটোরিয়াম ছিল না। নাটকসহ স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস, অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো উপজেলা পরিষদের ছোট্ট মিলনায়তনে। রেল স্টেশনের এপার-ওপার হওয়ার কারণে সঙ্গত কারণেই আড্ডা হতো রেল স্টেশনে। গার্ডের গাড়িতে করে সংবাদপত্র আসতো ঢাকা থেকে। পত্রিকার এজেন্ট পবিত্র বিশ্বাস মধু প্রতিদিন দুপুরে অপেক্ষা করতন- কখন ট্রেন আসবে? ছবির মতো ছোট্ট সুন্দর মজিবুর ভাই এর পানের দোকানটি বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই। চোখের সামনে এখনও ভাসে সুবিন্যস্তভাবে সাজানো হলুদ রঙের পাইনআপেল ও গোলাপী রঙের গ্লোকুজ বিস্কুটের প্যাকেট, পাঁচ পয়সা দামের লাল লম্বাকৃতির লজেন্স, মালার মতো করে ঝুলানো হজমির প্যাকেট। হজমির চেয়ে প্লাস্টিকের প্যাকেটের ভেতরে থাকা সবুজ রঙের খেলনা আংটিগুলিই ছিল প্রধান আকর্ষণ। এক সময় আন্দোলন সংগ্রামের তীর্থকেন্দ্র ছিল এই বারহাট্টা ইস্টিশন। ঢাকায় মিছিল নিয়ে যাওয়ার জন্য ভোর হওয়ার আগেই মিছিলের মানুষগুলো জমায়েত হতো এই স্টেশনে। জাসদ নেতা সাবেক এমপি আব্দুল মোতালিব খান পাঠানের একান্ত অনুগত মাইকিং বিশেষজ্ঞ আব্দুল গফুর তার মাইকিং এর সূচনা ও সমাপ্তি ঘটাতেন এই স্টেশনে। ট্রেন আসার সময় হওয়ার আগেই মাইক নিয়ে স্টেশনে অপেক্ষা করতেন প্রচারণাটা আরও বেশী মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। আওয়ামী লীগের জন্য সদা নিবেদিতপ্রাণ জয়পুরের হাসিম ভাই কম যেতেন না। সন্ধ্যা রাতের পর থেকেই সঙ্গীদের নিয়ে রাতের ট্রেনের অপেক্ষা করতেন ঢাকায় সম্মেলনে যাওয়ার জন্য-সেটা আওয়ামীলীগ কিংবা ছাত্রলীগ যে সংগঠনেরই হোক না কেন। বরাবরই কমন সঙ্গী হিসেবে থাকতো প্রয়াত কিসমত মোল্লা, অধীর দত্ত এবং বর্তমানে ইন্ডিয়া প্রবাসী গরমার শংকর। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের হরতাল অবরোধের সময় নিয়মিত মিছিল নিয়ে আসতেন আওয়ামীলীগ নেতা প্রয়াত হারুন-অর-রশীদ তালুকদার, গণতন্ত্রী পার্টির আলকাছ উদ্দিন আহমেদ ও কমিউনিস্ট পার্টির রমেন্দ্র নারায়ন সরকার, বয়োবৃদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা উসমান গণি ও মিছিল পাগল আসমত মোল্লা। বিক্রমশ্রীর নায়েব উদ্দিন ভাই তো ছাত্রলীগ, যুবলীগ , আওয়ামীলীগ সব মিছিলেই থাকতেন। কতোবার যে হরতালের সময় ট্রেন বন্ধ করতে গিয়ে পুলিশের সাথে ঝগড়া হয়েছে। ড্রাইভার অপহরণের কাহিনী বলে অপহরণকারীর তালিকায় স্বেচ্ছায় নাম উঠানো ঠিক হবে না। স্টেশনে এখন আছে কদ্দুসের স্টল। নাটকের রিহার্সেলের ফাঁকে ফাঁকে পুরনো ঐতিহ্যের ধারায় বন্ধু প্রদীপ সরকার শ্যামল, সাইফুল্লাহ খালেদ, পুলক দত্ত, প্রবীর দেবনাথ, হীরা, ফারুক সহ একদল নাট্যকর্মীদের নিয়ে এখনও আড্ডায় বসে। সাথে যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন মুখ। কলেজ শিক্ষক আমিনুল ইসলাম রিজভী , মুখলেছুর রহমান ও পুরনো নাট্যকর্মী আনিসুল আলম শামীমও আসেন মাঝে মধ্যে। কর্মস্থল থেকে অবসর নেয়ার পর তুষার কান্তি ঘোষ ও আলী মোস্তফা ভাই ও আসেন স্টেশন সংলগ্ন কংস থিয়েটারের কার্যালয়ে। ![]() ইদানীং নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। ২০১৮ সালে মায়ের মৃত্যুর পর দেশে গিয়ে, স্টেশনের প্রতিবেশী স্কুল শিক্ষিকা মাহমুদা আক্তার ও বন্ধুপত্নী মুক্তি সরকারকেও পেয়েছি স্টেশন সংলগ্ন কংস থিয়েটারের আড্ডায়। কতো কথা ,কতো স্মৃতি এই স্টেশনকে ঘিরে। ঈদ কিংবা পূজার ছুটিতে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরত ছাত্রদের অলিখিত আড্ডাস্থল ছিল এই স্টেশন। সকালের সবুজ ঘাসের উপর শিশির বিন্দুর মতো আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় এখন সতেজ বারহাট্টা ইস্টিশনের ছবি। স্টেশন সংলগ্ন বাসা হওয়ার সুবাদে নিজ শরীরের ছায়ার মতো আরও বেশী আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে পুরনো সেই স্মৃতি। শুধুমাত্র ট্রেনে চড়ার আনন্দ পাওয়া জন্য কতদিন যে স্কুল ফাঁকি বারহাট্টা থেকে মোহনগন্জ চলে গেছি...। সিনেমা দেখা শেষে ট্রেন ফেল করে নিজেকে নায়ক ভাবতে ভাবতে পায়ে হেঁটে গভীর রাতে বাড়ি পৌঁছে- ঘরে ঢুকেছি অপরাধীর বেশে। কারণে অকারণে স্টেশানে বসে থাকতাম। সিগন্যাল ডাউন দেখলেই স্টেশানে চলে যেতাম কিংবা বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতাম - শুধুমাত্র মানুষের মুখ দেখার জন্য। রাতের ট্রেনে ময়মনসিংহ থেকে ফেরার পথে অনেক সময় ঘুমিয়ে মোহনগন্জে চলে গিয়েছি অনেকদিন- সারারাত মোহনগন্জ স্টেশনে কাটিয়ে ফিরতে হতো পরদিন ভোরে। মোহনগন্জ থেকে ময়মনসিংহ জংশন পর্যন্ত প্রতিটি স্টেশনের নাম এক সময় প্রবল আগ্রহভরে মুখস্ত করেছিলাম- যা এখনও মনে আছে। বারহাট্টা থেকে কোর্ট- কাচারীসহ শহরমুখী মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই ট্রেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই দুরদুরান্তরের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হতো- ফিরতো রাতের ট্রেনে। সে দৃশ্যের মনকাড়া বর্ণনার সাথে আমাদের হৃদয়ের গভীরের সঞ্চিত ও সিঞ্চিত কথামালার আবেগ ফুটে উঠেছে মানস গুণের কবিতায়- “...নেমে যাওয়া যাত্রীরা ছুটে ইঞ্জিনের আলোয় দেখি তাদের বাড়ি ফেরা সে-ও এক আশ্চর্য ছন্দের মার্চপাস্ট। অতঃপর যে যার মতো চলে যায় স্টেশন আড্ডা রেখে দীপিকা আসছি বলে আমাকেও ফিরতে হয়। শুধু নিশুতি রাতের বুকে জেগে থাকে রূপকথার মতোন আমাদের কথামালা আর মহুয়া মাতাল বারহাট্টা ইস্টিশন।” ———————————- আসলাম আহমাদ খান ৮ জুন, ২০২০ নিউ ইয়র্ক। |