মাসিক শিক্ষাতথ্য পত্রিকা ২০০৮ সাল থেকে প্রিন্ট ভার্সনে প্রকাশিত হচ্ছে যার রেজি: ডি.এ. নাম্বার: ৫০৮৫, ঢাকা
প্রিন্টিং সংস্করণ
মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬ ১০ ভাদ্র ১৪৩৩
ছোটোগল্প---
জলে ভেজা গোলাপ
গল্পকার: শরীফ উদ্দীন
Published : Friday, 27 December, 2019 at 10:43 PM
শিক্ষাতথ্য, ঢাকা (২৭ ডিসেম্বর) :-
সামান্য কারণে প্রাণ খুলে হাসাহাসি করি। বন্ধুরা সহজভাবেই আমার এই হাসাহাসি সহ্য করে। বন্ধুদের সহজ মনোভাবের সুযোগ পেয়ে হাসি-ঠাট্টা করা আমার স্বভাবজাত হয়ে গেছে।

শীতকালীন ছুটির পর বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। ডিপার্টমেন্টের সামনের লিচুতলায় দেখলাম আমার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব গোল হয়ে বসে আছে। বন্ধু রনির ডান হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। আমিও গিয়ে বসে পড়ে রনিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোর হাত ভাঙল কি করে?’

রনি আফসোস করে উত্তর দিল, ‘এই ছুটিতে দেশে গিয়েছিলাম। দাদার জমিজমা ভাগাভাগি নিয়ে চাচাতো-মামাতো ভাইয়ের মধ্যে মারামারি। থামাতে গিয়ে মাঝখান থেকে আমার হাতে চোট পেল।’

রনির কথা শেষ হবার আগেই আমার আবারও জিজ্ঞাসা, ‘তোর চাচা-ফুপু কতজন?’

আমার প্রশ্নের উত্তরে রনি বলল, ‘অনেক। আমাদের বাপ-চাচা-ফুপু মিলে আটজন।’

আমাদের সাথে অহনা, রত্না, সালমার উপস্থিতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে চোখে বিস্ময় ফুটিয়ে তুলে প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে বললাম, ‘আটজন! বন্ধু, এসব ছাড়া তোর দাদার আর কোনো কাজকর্ম ছিল না?’

আমার প্রশ্নের ঢঙ দেখে সবাই হাসছে। রনি এবার আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোর দাদার ছেলে-মেয়ে কতজন?’

আমি ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বিজয়ীর ভঙিতে আমার মাথার উপর দিয়ে ভি-আকৃতিতে দুই আঙুল তুলে ধরলাম। রনির পাশ থেকে গৌতম মন্তব্য করল, ‘রাতুল, তোর দাদু তাহলে অনেক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন।’

আমি বিজ্ঞ কণ্ঠে গৌতমের মন্তব্যের সাথে যোগ করলাম, ‘অবশ্যই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন। আমার দাদা যেন রনির দাদার কাছে হেরে না যান এজন্য আমার চাচা-ফুপুর সংখ্যা রনিরদের চেয়ে দুজন বেশি।’

আমার কথা শেষ না হতেই ডান হাতে চোট থাকায় বাম হাত দিয়ে রনিকে পায়ের চটি খুলতে দেখে আমি হাসতে হাসতে দ্রুত পায়ে ডিপার্টমেন্টের দিকে রওনা দিলাম।

কয়েকধাপ না যেতেই রনিই ডাক দিল, ‘তোকে কিছু বলব না। দরকার আছে। শুনে যা।’

আমি গিয়ে বসতেই সালমা বলল, ‘রাতুল, আমাদের শেষ বর্ষ। কদিন পর একেকজন একেক দিকে ছড়িয়ে পড়ব। আমাদের বর্ষের ছেলে-মেয়েরা মিলে একটি সাময়িকী বের করব। সে কারণেই এখানে বসা।’

অহনা আমার মুখোমুখি বসা। সালমার কথা শেষ হলে অহনা বলল, ‘রাতুল, তোমাকে কিন্তু একটি গল্প দিতে হবে। কালো মেয়ের গল্প।’

নিজে ফর্সা হয়েও অহনার আমাকে কালো মেয়ের গল্প লিখতে বলার আবদার শুনে কৌতুহলী হবার কথা কিন্তু তা না হয়ে মনে হলো, বুকের ভিতরে ভোঁতা কিছু দিয়ে আঘাত করে অহনা আমার স্মৃতির দুয়ারটা খুলে দিল। বন্ধুদের সাময়িকী নিয়ে শুরু হওয়া আলাপ-আলোচনা আমার কান থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছাচ্ছে না। জরুরি কাজ আছে বলে উঠে গিয়ে আমি সেমিনার লাইব্রেরির উদ্দেশে হাঁটা দিলাম।

কালো বোনের ভাই আমি। রেবা আপার থেকে আমি প্রায় আট বছরের ছোটো। মায়ের কাছে আমার কোনো আবদার খারিজ হয়ে গেলে আপা ছিলেন আমার শেষ ভরসা।

আপা খুব হাসতেন। কথায় কথায় খিল খিল করে হাসতেন। সামান্য কারণে হাসতে দেখে মা মাঝে মাঝে বকুনি দিতেন। লাভ হতো না। মা বকুনি দিতে শুরু করলে আপা আরও জোরে হেসে উঠতেন কিন্তু বিয়ের সম্বন্ধ আসা শুরু হবার পর থেকে আপা কেমন যেন বদলে যেতে থাকলেন। পাত্রপক্ষ দেখে যাবার কয়েকদিন পর ঘটক এসে ফলাফল জানাতেন, ‘রেবা পাত্রী হিসেবে পছন্দ না হবার মতো নয় সে আমরা জানি। শান্ত-শিষ্ট লক্ষী মেয়ে।’

আব্বা ঘটকের কথা শেষ হবার আগেই নড়ে চড়ে বসতেন কিন্তু ঘটক কথা শেষ করতেন এই কথা বলে, ‘পাত্রপক্ষ বলছিল, গায়ের রঙটা যদি আরেকটু চড়া হতো!’

সব আব্বার কাছেই মেয়ে হচ্ছে নিজের কলিজার একটি অংশ। ঘটক চলে গেলে আব্বা তার সেই কলিজাকে অগ্রাহ্য করার যন্ত্রণায় নিজেকে সামলাতে না পেরে পাত্রপক্ষ সম্পর্কে উল্টাপাল্টা কথা বলা শুরু করতেন। আব্বার হাবভাব দেখে মনে হতো পাত্রপক্ষ যেন বাড়ির সদর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সদর দরজার দিকে মুখ করে আব্বা শুরু করতেন, ‘তোদের পছন্দ হলেও অমন ঘরে আমি মেয়ে দিতাম না-কি? ভদ্রতা জ্ঞান বলে তোদের কিছু আছে? হা-ভাতের বংশ! খাওয়ার ধরন দেখে মনে হয়, মেয়ে দেখতে আসার আগে খিদে বাড়ানোর জন্য হালের বলদ সেজে জমি চাষ করে এসেছে।’

পাত্রপক্ষ না-রাজি জানিয়ে দেবার পর আপা কেমন জানি চুপচাপ হয়ে যেতেন। প্রথম দু’তিন দিন নিজের ঘর থেকে সচারচর বের হতেন না। দেখে মনে হতো, আপা যেন সংসারের কাছে কোনো অপরাধ করে ফেলেছেন সেই লজ্জায় নিজেকে ঘরে আটকে রেখেছেন।

মা বকুনি দিলে আব্বা মুখ বন্ধ করতেন কিন্তু বাজার করা বন্ধ করতেন না। ঘটক নতুন সম্বন্ধ নিয়ে এলে ধার-কর্জ করে হলেও বহুপদী বাজার করতে ছুটতেন।

এক সময় আপার জেদের মুখে বাড়িতে ঘটক আসা বন্ধ হলো। আপা জেদ ধরলেন, পড়ালেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে করবেন না।

পড়ালেখা শেষ হলে কিছুদিনের মধ্যেই আমি যে স্কুলে পড়তাম আপা সেই স্কুলে সহকারি শিক্ষকের চাকরি পেলেন।

আমাদের স্কুলে কয়েক বছর আগে উচ্চ মাধ্যমিক শাখা খোলায় শিক্ষক সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। হাসান স্যার উচ্চ মাধ্যমিক শাখার শিক্ষক হলেও আমাদের দশম শ্রেণির ইতিহাস ক্লাস নিতেন। একদিন বিকেলে হঠাৎ হাসান স্যার আমাদের বাড়ি এলেন। আমি চা-নাস্তা দিতে ঘরে ঢুকতেই দেখলাম, আপা আমাকে দেখে আঁচলের নিচে দু-তিনটা গোলাপ আড়াল করলেন। আমি পেট পাতলা ছেলে। ঘর থেকে বের হয়েই ঘটনাটি মায়ের কাছে লিক করে দিলাম। মা মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, ‘যা হতছাড়া! তোর নিজের কাজে মন দে।’

স্যার চলে যাবার পর আপা মাকে কি বলেছিলেন জানি না। কয়েকদিন পর মায়ের কথায় বুঝলাম, স্যারের সাথে আপার বিয়ে হবে। বাড়ির সবার মনে একটা সুখ-সুখ ভাব।

মা পই পই করে মানা করেছিলেন, আমি যেন রেবা আপার সাথে হাসান স্যারের বিয়ে হতে চলেছে এই কথা কাউকে না বলি। মায়ের মানা রাখতে পারলাম না। ক্রিকেট আমার ধ্যান-জ্ঞান। ক্লাবে প্র্যাকটিস করি। সুমন আমার ক্লাস-ক্লাব দুজায়গারই বিশ্বস্ত বন্ধু। সুমনের কাছে আমার পরিবারের এতবড় আনন্দের কথা চেপে রাখতে পারলাম না। আপার বিয়েতে আমরা বন্ধুরা কি কি করব তার পরিকল্পনাও দুজনে মিলে চূড়ান্ত করে ফেললাম।

একদিন হাসান স্যারের ভাই-ভাবি-বোন-দুলাভাইসহ কয়েকজন এসে বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করে গেলেন। আব্বা মাকে বললেন, ‘আমার রেবা মায়ের বিয়ে আমি খুব ধুমধামের সাথে দিব। উত্তর পাড়ার মসজিদের পিছনের সাড়ে চার শতক মাটি খামোখা পড়ে আছে। ওটা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি বাধা দিও না।’

আমি যেমন সুমনের কাছে আমার সুখ-দুঃখের গল্প না করে থাকতে পারি না তেমনি আপাও আমাদের দূর সম্পর্কের মামাতো বোন মিনা আপার সামনে তাঁর সব কথা না বলে থাকতে পারেন না। রেবা আপার থেকে মিনা আপা বয়সে ছোটো হলেও দুজনের সম্পর্ক অনেকটা বান্ধবীর মতো। হাসান স্যার আমাদের বাড়ি এলে ভালো-মন্দ রান্না হয়। আপা মোবাইল করে রিনা আপাকে ডেকে পাঠান। রিনা আপা শ্যালিকা হিসেবে স্যারের কাছে এটা-ওটা আবদার করতেও দ্বিধা করতেন না। একদিন সবার সামনেই হাসতে হাসতে স্যারকে বললেন, ‘দুলাভাই, বিয়ের সময় কিন্তু আমাকেও একটি দামি শাড়ি দিতে হবে।’

হাসান স্যার মিনা আপার শাড়ির অনুরোধ রেখেছিলেন। যতটা না দামি চেয়েছিলেন হাসান স্যার তার চেয়ে অনেক বেশি দামি শাড়ি মিনা আপাকে দিলেন। বিয়ের শাড়ি। আমার মোবাইল নেই। যতক্ষণ বাড়ি থাকি মায়েরটাই আমার কাছে রাখি। সুমন খুব সকালে ফোন করে আমাকে বলল, ‘হাসান স্যারের সাথে গত রাতে তোর মিনা আপার বিয়ে হয়ে গেছে। আমি এখনি শুনলাম।’

আমি তাড়াহুড়া করে ফোন কেটে দিয়েই মাকে গিয়ে খবরটা দিলাম। মা বিদ্যুতের শক খাওয়ার মতো চমকে উঠলেন। কোনো কথা না বলে প্রথমে নিজের ঘরে গিয়ে আব্বাকে খবরটি দিলেন। তারপর রেবা আপার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। মায়ের সাথে আমিও ঢুকলাম।

আপা খাটের উপর বসে পিছনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। কোলে ভাঁজ করা বই। আপা আমাকে দেখার আগেই আমি বাইরে বেরিয়ে আপার দরজার পাশে বারান্দায় বসে থাকলাম। আব্বাও নিজের ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন।

বারান্দা থেকে শুনতে পাচ্ছি মা অবিশ্বাস্য কণ্ঠে জিজ্ঞাসা আপাকে করলেন, ‘সুমন ফোন করে রাতুলকে জানাল, হাসানের সাথে না-কি গত রাতে মিনার বিয়ে হয়ে গেছে?’

আপা শুষ্ক কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘আমাদের নয়না আপা আমাকে রাতেই মোবাইল করে জানিয়েছেন। এ নিয়ে আর কোনো কথা নয়। তোমার অন্য কোনো কথা থাকলে বল।’

মা কষ্টে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আবার বলা শুরু করলেন, ‘কথা বলব না কেন? মিনাকে হাসানের সাথে পরিচয় করে দেয়ার কি দরকার ছিল? নিজের গায়ের রঙ ভুলে গেলি? হাসানের সাথে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করিস। কত বড় লজ্জার ব্যাপার!’
আব্বা বাইরে থেকে মাকে ধমক দিলেন, ‘রেবার মা, তুমি বাইরে এসো। কিসের লজ্জা? আমরা কি কথার বরখেলাপ করেছি? যারা কথা দিয়ে কথা রাখল না এটা তাদের লজ্জা। আমার মেয়ে ফেলনা নয়। ভাগ্য বলেও একটা কথা আছে। আমি বলছি, তুমি বাইরে এসো।’

আব্বা এবারে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘তুই এখানে দাঁড়িয়ে কেন? আজ না তোদের ফাইনাল খেলা? খেলতে যা। রিয়াজ তোকে নিয়ে বড় আশা করে।’

রিয়াজ ভাই আমাদের ক্রিকেট ক্লাবের মালিক-কোচ দুটোই। খুব ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। মটর সাইকেল দুর্ঘটনার কারণে রিয়াজ ভাইয়ের খেলার মাঝ পথে বিরতি পড়ল। আগের ফর্ম আর ফিরে পেলেন না। অন্যদেরকে দিয়ে এখন নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করেন। বয়স তিরিশ পেরিয়ে গেছে। বিয়ে-থা করেন নি। চৌমাথা মার্কেটে চারটি দোকান ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। আবাদি জমির পারিমাণও কম নয়। লোকে বিয়ের কথা বললে বলেন, ‘আমার ক্লাবই আমার সংসার।’

চেয়ারম্যান সাহেব উদ্যোগ নিয়ে টিএনও কাপ খেলা ছেড়েছেন। আমাদের থানায় তেরোটি ইউনিয়ন। আমাদের ইউনিয়ন ফাইনালে উঠেছে। মহিপুর ইউনিয়নের সাথে আমাদের ফাইনাল খেলা।

মা আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে আপার ঘর থেকে বের হয়ে রান্না ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।

আপার কষ্ট বোধহয় আব্বা সহ্য করতে পারছিলেন না। জমির ধান দেখার উছিলায় বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন।

আমি এক জায়গাতেই ঠাঁই বসে আছি। মা ধাতস্থ হয়ে এবারে ধীর পায়ে আপার ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মা রে, তোর খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না?’আপা মিথ্যে বললেন না। মায়ের প্রশ্নের উত্তরে আপাকে বলতে শুনলাম, ‘হ্যাঁ, মা, খুউব কষ্ট হচ্ছে। মানুষ কেন এমন হয়?’

মা আমার নাম ধরে ডাক দিয়ে বললেন, ‘রাতুল, রান্না ঘরে চুলার উপরে দুধ দিয়েছি। রেবার জন্য এক গ্লাস দুধ নিয়ে আয়, বাবা।’

দুধের গ্লাস হাতে আপার ঘরে ঢুকে চমকে উঠলাম। এক রাতের মধ্যে আপার মুখটা কেমন জানি মলিন হয়ে গেছে। গ্লাসটা মায়ের হাতে দিয়ে নিজের ঘরে এলাম।

আপা আদর দিয়ে কথা বলার সময় আমার আচরণের সাথে যুৎসই নাম ধরে ডাকতেন। আমি ম্যাচ খেলতে গেলেই আপা পিছন থেকে বার বার সাবধান করে দিতেন, ‘এই বাঁদর, পিচে নেমে ব্যাট হাতে বাঁদরামি করিস না।’

জানি, আপার মনে আজ খুব কষ্ট। তবু বাড়ি থেকে বের হবার সময় বার বার মনে হচ্ছিল এই বুঝি আপা ডাক দিয়ে সেই একই কথা বলবেন। মন মানছিল না। বাড়িটা চেখের আড়ালে চলে যাবার আগ মুহূর্তে শেষ বারের মতো পিছনে তাকালাম। অন্য দিনের মতো আপা দাঁড়িয়ে নেই।

মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছি। আমার জগতের অনেকটা জুড়ে রয়েছেন আপা। আপার দুর্ভাগ্য দেখে সামনে যা কিছু আছে সব ভেঙে চৌচির করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। সামনে একটি মটর সাইকেল ব্রেক কষলে তাকিয়ে দেখি সুমন। সুমন বলল, ‘তাড়াতাড়ি উঠ।’

ডাকবাংলো মাঠে খেলা। বিশাল মাঠ। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বয়ং এমপি। পুরস্কার মঞ্চে টিএনও স্যার, কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান, ওসি, জামতলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষসহ গণ্যমান্য অনেকেই রয়েছেন। চারিদিকে দর্শক থৈ থৈ করছে। মহিপুর যে টার্গেট দিয়েছে তাতে জেতা শক্ত। দলের পঞ্চাশ রানের আগেই তিনজন আউট হয়ে গেলে আমাকে নামানো হলো।

চারিদিকে দর্শকের আনন্দ উল্লাস শুধু আমার রেবা আপা একবুক যন্ত্রণা নিয়ে ঘরের কোণে চুপটি করে বসে আছে। পিচে নেমে পজিশন নিয়ে দাঁড়াতেই রাস্তার সেই ভেঙে ফেলার অদম্য ইচ্ছেটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। আমার সামনে ভেঙে ফেলার মতো কিছু নেই। আছে শুধু বোলারের কাছে থেকে ধেয়ে আসা বল। মুহূর্তের মধ্যে ক্রিকেটের গ্রামার ভুলে গেলাম। আমি ভাঙতে শুরু করলাম। যখনই দর্শক হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠছে আমি চারিদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে মনে মনে বলছি, ‘তোমরা জান না, আমি চার-ছক্কার জন্য মারছি না। দলকে জেতানোর জন্যও খেলছি না। আমার বুকের ভিতরে ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। সেই যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে আমি বলটাকে ভাঙতে ব্যাট ছুঁড়ছি।’

আমার একক রান যখন সাতানব্বই তখন আমাদের দলের ক্যাপ্টেন ফারুক ভাই এসে আমাকে বললেন, ‘রিয়াজ ভাই জিজ্ঞাসা করছিলেন, তোর কিছু হয়েছে কি-না? নিয়ম ভেঙে খেলছিস। রিয়াজ ভাই তোকে অনুষ্ঠান শেষে দেরি করতে বললেন।’

আমি যে ঠিক নেই তা অন্তত একজন বুঝেছেন। রিয়াজ ভাইয়ের আন্তরিকতায় আমার চোখ ভিজতে শুরু করল। ভেজা চোখে বোলারের কাছে থেকে ছুটে আসা বলকে আমার কাছে যমজ কলার মতো দুটো লেপ্টে থাকা বল মনে হতে লাগল। মারার মতো বল। আমি ব্যাট ছুঁড়লাম কিন্তু বল উপরে উঠে গেল। সহজ ক্যাচ। আমি অপেক্ষা না করে পিচ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। দুজন ফিল্ডার দুদিক থেকে দৌড়ে এসে এক সাথে ক্যাচ ধরতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে মিস করে ফেলল। দর্শক আনন্দে লাফিয়ে উঠল। ধারাভাষ্যকার বার বার আমার নাম নিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু আমার চোখের সামনে শুধুই সকালে দেখা আপার মলিন মুখ।

আরও কয়েক ওভার খেলে যখন আউট হলাম আমাদের ম্যাচ জয় তখন সুনিশ্চিত।

সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। বাড়ির কাছাকাছি এসে দীঘির পাড়ে রিয়াজ ভাই মটর সাইকেল থামালেন। দীঘির বাঁধানো ঘাটে বসে আমাকে বললেন, ‘কিছু লুকোতে পারবি না। তোর কি হয়েছে বল?’

রিয়াজ ভাইয়ের আন্তরিকতায় গলে গিয়ে আমি কিছুই বাদ রাখলাম না। হাসান স্যারের আমাদের বাড়িতে প্রথম আসা থেকে মিনা আপাকে বিয়ে করার সব ঘটনা খুলে বললাম। বাড়ির সকলের মনের অবস্থাও বলতে দ্বিধা করলাম না।

আমাকে বাড়ি যেতে বলে রিয়াজ ভাই চলে গেলেন। জগদীশ কাকুর বাড়িতে পুজো। ঢোলের শব্দ ভেসে আসছে। জোৎস্নার আলো দেখা দিচ্ছে। আমি বাড়ি না গিয়ে আবার ঘাটে গিয়ে বসলাম। অবসাদে সারা শরীর ভেঙে পড়ছে। আমি চোখ বন্ধ করে ঢোলের শব্দ শুনছি। মাথায় কারো হাতের স্পর্শ পেতেই চোখ খুলে দেখি আপা। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আপা নরম কণ্ঠে বললেন, ‘এভাবে কেউ খেলে? যদি অসময়ে আউট হয়ে যেতিস?’

আপার স্নেহভরা কণ্ঠ শুনে আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি গড়াতে শুরু করল। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আপা, তুমি আজ আমার খেলা দেখেছো?’

আপা মলিন মুখে মৃদু হাসি দিয়ে আমাকে উল্টো প্রশ্ন করলেন, ‘এত বড় ম্যাচ, তুই খেলবি আর আমি দেখব না? প্রথমে গিয়ে ফিরে এসে দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে তোর খেলাটা দেখে চলে এসেছি।’

আমি অনুযোগ করে বললাম, ‘তাহলে আমি যখন বাড়ি থেকে বের হই..

আপা আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘তখন বলি নি এখন বলছি, ‘বাঁদর কোথাকার! পিচে নেমে আর যদি বাদরামি করিস!’

উঠতে উঠতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমি যে এখানে তুমি জানলে কি করে?’

আপা বললেন, ‘আমি বড় রাস্তার ধারে তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তোরা যে কখন পাশ কেটে এসেছিস টের পাই নি। রিয়াজ ভাইয়ের ফেরার পথে আমার সাথে দেখা।’

ঘটনার সূচনা কিভাবে বাড়ির কেউ জানতাম না। ম্যাচ খেলার এক-দেড় মাস পরের কথা। রাতের বেলা সবাই এক সাথে খেতে বসেছি। আপার উপস্থিতিতে বললে আব্বা হয়তবা অমত করবেন না এই চিন্তা মাথায় নিয়ে কি-না জানি না, সবার খাওয়ার শেষের দিকে মা আব্বাকে বললেন, ‘আজ দুপুরে হঠাৎ রিয়াজ এসেছিল।’

ঢোক গিলে মা আবার শুরু করলেন। রিয়াজ আমাকে বলল, ‘মা জননী, আমি বিএ থার্ড ক্লাস। কোনো কাজকর্মও করি না। রেবাকে বলতেই আপনাদের দেখিয়ে দিলেন।’

রিয়াজ ভাই যে আগেই আপার সম্মতি পেয়েছেন তা বুঝতে কারো অসুবিধে হল না। আপার দিকে মা একবার তাকিয়ে নিয়ে আব্বাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এ বিষয়ে তোমার মতামত কি?’

মায়ের প্রশ্নের উত্তরে আব্বা বললেন, ‘আর দু চামচ ভাত দাও। তরকারিটা বড় ভালো রান্না করেছো।’

এক সপ্তাহ না যেতেই রেবা আপার বিয়ে হয়ে গেল একজন সাদা মনের মানুষের সাথে। আব্বা অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন কিন্তু রিয়াজ ভাই আব্বাকে মসজিদের পিছনের সেই জমিটা বিক্রি করতে দিলেন না।

অহনার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। তাকিয়ে দেখি সেমিনার ফাঁকা হয়ে গেছে। অহনা এসে আমার পাশে বসে কথা শুরু করল, ‘রাতুল, আমি আব্বার গায়ের রঙ পেয়েছি। ফর্সা হবার সুবাদে হয়ত মাকে আমার বিয়ের জন্য দুশ্চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু আমার মা? চাপা রঙের নিচে একদিন আমার মায়ের সব সুখ-স্বপ্ন চাপা পড়ে গিয়েছিল। তখন তোমাকে কালো মেয়ের গল্প লিখতে বললাম না? তুমি লিখবে, আমার মায়ের গল্প?’

আমি এক দৃষ্টিতে অহনার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে গেলাম, ‘তোমার আম্মুর গল্পে নতুন কি আর লিখব? নিজের বোনকে দিয়ে জেনেছি, এ দেশের বেশিরভাগ কালো মেয়েই হচ্ছে নিজের চোখের জলে ভেজা একেকটি গোলাপ।’

মনটা আগে থেকেই ভারি হয়ে ছিল। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে অহনাকে বললাম, ‘অহনা, আমাকে ক্ষমা কর। কালো মেয়েদের কষ্ট নিয়ে আমি কোনো গল্প লিখব না। গল্প আমি লিখব তবে কালো মেয়েদের জীবন-সমাজ-সংসারে জয়ী হওয়ার গল্প।’

অহনাকে হল গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম কিন্তু রাস্তায় আমাদের মধ্যে আর কোনো কথা হল না।

২৭-১২-২০১৯


এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও প্রকাশকের পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনী।



সর্বশেষ সংবাদ
ঐতিহ্য ও ঐক্যের বন্ধনে মৌলভীবাজার জেলা সমিতি
কক্সবাজারের ইনানীতে নির্মিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের আইকনিক টাওয়ার সম্বলিত ফাইভ স্টার হোটেল এন্ড রিসোর্ট
মায়ের আদেশে প্রতিদিন পাঁচজন রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেন অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান তরফদার
জালালাবাদ এসোসিয়েশনের উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত : চিকিৎসা সেবা পেলেন অর্ধশতাধিক রোগী
সর্বাধিক পঠিত

  • ফেসবুকে আমরা
    বিশেষ জ্ঞাতব্য: বিজ্ঞাপন ও অনুদানের চেকটি Masik ShikshaTotthow নামে A/C Payee প্রদান করতে হবে। অথবা হিসাবের নাম: মাসিক শিক্ষাতথ্য (Masik ShikshaTotthow), হিসাব নাম্বার: ৩৩০২২৩৮৪, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, শিল্পভবন কর্পোরেট শাখা, ঢাকা”-তে অনলাইনে ক্যাশ/চেক জমা দেওয়া যাবে। তৃতীয়ত: ক্যাশ পাঠানো যাবে-বিকাশ: ০১৮১৯১৪৩৬৬৪, ০১৭১৫৬৬৫৫৯২। রকেট: ০১৭১৬২০৫৩০৪০। এজেন্ট ব্যাংকিং নাম্বার: ৭০১৭৫১১৭৬০৬২৭ (ডাচ-বাংলা ব্যাংক)।


    ● সাক্ষাৎকার
    ● শিক্ষা সংবাদ
    ● সারাদেশ
    ● জাতীয়
    ● রাজনীতি
    ● আন্তর্জাতিক
    ● সাহিত্য চর্চা
    ● চাকরীর তথ্য
    ● ব্যাংক-বীমা অর্থনীতি
    ● সম্পাদকীয়
    ● শুভ বাংলাদেশ
    ● সুধীজন কথামালা
    ● বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি
    ● প্রতিষ্ঠান পরিচিতি
    ● শিক্ষক কর্ণার
    ● শিক্ষার্থী কর্ণার
    ● সফলতার গল্প
    ● বিশেষ প্রতিবেদন
    ● নিয়মিত কলাম
    ● মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা
    ● অনিয়ম-দুর্নীতি
    ● ভর্তি তথ্য
    ● বিনোদন
    ● লাইফস্টাইল
    ● খেলাধুলা
    ● ধর্ম ও জীবন
    ● পাঠকের মতামত
    ● জন্মদিনের শুভেচ্ছা
    ● বিবাহ বার্ষিকীর শুভেচ্ছা
    ● শোকগাঁথা
    ● স্বাস্থ্যতথ্য
    ● শিক্ষাতথ্য প্রকাশনী
    ● টিউটোরিয়াল
    ● ইতিহাসের তথ্য
    ● প্রবাসীদের তথ্য
    ● অন্যরকম তথ্য
    ● শিক্ষাতথ্য পরিবার
    সম্পাদক ও প্রকাশক: মুহাম্মাদ তছলিম উদ্দিন
    ২২৩ ফকিরাপুল (১ম লেন), মতিঝিল, ঢাকা থেকে সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত
    এবং প্রিন্ট ভার্সন : আলিফ প্রিন্টিং প্রেস, ২২১ ফকিরাপুল (১ম লেন), ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
    ফোন: ৭১৯১৭৫৮, মোবাইল: ০১৭১৫৬৬৫৫৯২। বিজ্ঞাপন: ০১৮১৯১৪৩৬৬৪,
    ইমেইল: shikshatotthow@gmail.com (নিউজ এন্ড ভিউজ), ad.shiksha2008.gmail.com (বিজ্ঞাপন)