
| Headline : |
|
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে লেখাটি নিবেদিত
বঙ্গবন্ধু কেন সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি
লেখক : মো. সফিকুল ইসলাম, উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
|
|
শিক্ষাতথ্য, ঢাকা (১৭ মার্চ) :-
![]() স্কেচ - বরেণ্য শিল্পী হাশেম খান এক জাতির এক দেশ; এই দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’; আমাদের প্রিয় স্বদেশ। এক জাতির এক রাস্ট্র বলে বাংলাদেশকে বলা হয় ‘জাতি রাস্ট্র’। আমাদের দেশের সকল ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেই ‘আমরা বাঙালি’। ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি’ এই শ্লোগানে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয় মহান একাত্তরে। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান বাঙালির মুখে তুলে দেন জাতির পিতা। আমরা প্রাচীন বঙ্গ দেশের মানুষ। বঙ্গের সন্তানরাই আজকের বাঙালি জাতি। এই জাতির ইতিহাস অতি প্রাচীন। বঙ্গদেশ কালক্রমে বাংলাদেশ হয়েছে। ‘বঙ্গদেশ’ বা ‘বাংলাদেশ’ মূলতঃ এক ও অভিন্ন সত্তা। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ প্রাচীন বাঙালি জাতিসত্তা থেকেই উৎসারিত হয়েছে। বাঙালি জাতির ইতিহাস হাজার হাজার বছরের। প্রাচীন বঙ্গদেশের বুকেই আধুনিককালে রক্তাক্ত অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রের। এই রাষ্ট্রের অমর শ্রষ্ট্রা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি বাংলাদেশের সব সম্প্রদায়ের মানুষ হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃস্টান সবাইকে একত্রিত করে এক অখণ্ড বাঙালি জাতিতে পরিণত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ সংগ্রাম করে ধাপে ধাপে স্বাধীনতার চেতনায় জাতিকে উজ্জীবিত করেছেন। একজন নেতা একক নেতৃত্ব দিয়ে একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার ঘটনা বিশ্বে আর ঘটেনি। মহান একাত্তরে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাঁর ডাকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিকামী সাড়ে সাত কোটি বঙ্গসন্তান। বঙ্গবন্ধুর বিশাল দেহটাই যেন তখন পরিণত হয়ে যায় দেশ-জাতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে। ৩০ লাখ মুক্তিকামী বঙ্গসন্তান তাঁদের বুকের তাঁজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তানীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনে প্রাণের স্বাধীনতা। এই ১৬ই ডিসেম্বরে বাঙালি জাতি প্রথম স্বাধীনতা লাভ করে; নিজেদের ভূখণ্ড হয়; পতাকা হয়। বাঙালি জাতির কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে দেখা যায়, আবহমানকাল থেকে বাঙালি জাতির নিজস্ব ভাষা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি ছিল। ছিল না কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। বঙ্গদেশের হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে একমাত্র বঙ্গবন্ধুই বঙ্গসন্তানদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রবির্নিমাণ করেছেন। তাই, বঙ্গ বা বাংলাদেশের ইতিহাসে; বাঙালি জাতির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’র মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে আছেন। বাঙালি জাতি বা বাংলাদেশ (প্রাচীন বঙ্গদেশ) কোনোকালেই স্বাধীন ছিল না। পরাধীনতার শেকলে বন্দী ছিল এদেশের মানুষ। পৌরাণিক ইতিহাস মতে, মানবজাতির সৃষ্টির সূচনা থেকেই বঙ্গদেশে মানুষের বাস শুরু হয়। তবে লক্ষ কোটি বছর আগের বাংলাদেশ কেমন ছিল তা জানা যাচ্ছে না। তবে বিগত পাঁচ হাজার বা কিছু কম-বেশি বছরের বাংলাদেশ বা বাঙালি জাতির লিখিত ইতিহাস রয়েছে। এই সময়ের ইতিহাসপাঠে দেখা যায়, প্রাচীন বাংলায় একক কোনো রাষ্ট্রকাঠামো ছিল না। প্রাচীন বাংলা তখন বহু জনপদে বিভাজিত ছিল। বাংলার ভিত্তি গড়ে তুলে এসব জনপদ। উল্লেখযোগ্য জনপদগুলো হলো : বঙ্গ, পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর, বরেন্দ্র, সমতট, গৌড়, হরিকেল, রাঢ়, বজ্রভূমি, বর্ধমান-কঙ্কগ্রাম, তাম্রলিপ্তি, চন্দ্রদ্বীপ, কোটিবর্ষ, কজংগল, কর্ণসুবর্ণ। সপ্তম শতকেও এসব জনপদের প্রভাব ছিল। তবে, বঙ্গ জনপদ অতি প্রাচীনকাল থেকেই স্বতন্ত্র বজায় চলেছে। প্রাচীনকাল থেকেই বহু শাসনযুগের ও বিভিন্ন ধর্ম-বিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ পরিচালিত হয়েছে। বহু সংস্কৃতির দেশ বাংলাদেশ। প্রাগ-ঐতিহাসিক আমলের বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানার তেমন কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলেও খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে আর্যরা বাংলাদেশে প্রবেশের পর থেকে বাঙালি জাতির নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি-সভ্যতা, ঐতিহ্য এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইতিহাস জানা যায়। অপরদিকে খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগের প্রাচীন ভারতের সিন্ধুসভ্যতার (হরপ্পা-মহেঞ্জাদারো) মানববসতির ইতিহাস সম্পর্কে বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে জানা যাচ্ছে। প্রাচীন ভারতীয় সমাজের অঙ্গীভূত হওয়ায় বর্তমানের বাংলাদেশও সিন্ধুসভ্যতার গর্বিত অংশীদার। পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব যুগে নন্দ, মৌর্য এবং শুঙ্গ শাসন এরপর কুশান, পাল, সেন, মুসলিম, ফরাসি, জমিদারি, বৃটিশসহ বহু শাসন আমাদের দেশে পরিচালিত হয়েছে। এই কয়েক হাজার বছরে বাঙালি জাতি কখনোই নিজেরা নিজেদের শাসন করতে পারেনি। বাঙালি জাতি পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অসীম সাহসী নেতৃত্বে। বাংলার মাটি ও মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে প্রগাঢ় ভালবাসা ছিল অতুলনীয়। তাঁর শক্তি ছিল বাঙালি জাতি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ঘিরে। বঙ্গ-ইতিহাসে এমন প্রত্যয়ী বিরল দেশ-প্রেমিক বঙ্গ-সন্তান আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি আজীবন সংগ্রাম ও নির্যাতন ভোগ করে গেছেন ন্যায়-নায্যতা-শান্তি ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য; একটি জাতির স্বাধীনতার জন্য; অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য। এই শ্রেষ্ঠ বঙ্গসন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যিনি বাংলার মানুষের জন্য শুধু তাঁর নিজের নয়, তাঁর বংশের রক্তবিন্দুও দান করে গেলেন। স্বাধীনতার পর পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ঢাকায় সংবর্ধিত অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ভাষণে বলেন, ‘...আমার ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে। আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছে। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু এসে থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব, আমার বাঙালি জাতিকে অপমান করে যাব না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না এবং যাবার সময় বলে যাব, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।’ শেখ মুজিবের মত এমন সন্তান জন্ম দিয়ে বাংলা মায়ের স্বর্ণ-জঠরও যেন ধন্য। বঙ্গবন্ধু আবহমান বাঙালি সভ্যতাকে প্রতিনিধিত্ব করে চলেছেন বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান হয়ে; তিনি বাঙালির মহাকালের মহানায়ক। বিশ্ব-মানবতার পরম বন্ধু কিউবান বিপ্লবের নায়ক ফিদেল ক্যাস্ট্রো ১৯৭৩ সালে আলজিরিয়ায় নির্জোট সম্মেলনে মহাকালের দুর্গম পথের ক্লান্তিহীন অভিযাত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কাছ থেকে দেখে বলেছিলেন, ‘একসময় নেপাল গিয়ে মনোরম হিমালয় দেখবার প্রবল ইচ্ছা ছিল, আজ আপনাকে স্বচক্ষে দেখে সে ইচ্ছা উবে গেল। হিমালয় দেখবার আর প্রয়োজন নেই।’ সত্যিই মুজিব আমাদের হিমালয়, বাংলার এভারেস্ট। তাই বঙ্গবন্ধুকে দেখলে বাংলাদেশ দেখা হয়। বঙ্গবন্ধুকে জানলে বাংলাদেশকে জানা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির হৃদয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন মহাকালের পথ বেয়ে। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। |