
| Headline : |
|
৯৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় : বাংলার ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ
মো. সফিকুল ইসলাম
|
|
দৈনিক শিক্ষাতথ্য, ঢাকা
(১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩) :-
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে বাংলার ইতিহাস রচনা ও চর্চার পথিকৃৎ। মাতৃভূমির ইতিহাস সাধনায় তিনি সমগ্রজীবন উৎসর্গ করেছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশক (মৃত্যুঅবধি) অক্ষয়কুমার ছিলেন বাংলার প্রধান ইতিহাসবিদ। বলা হয়ে থাকে ‘অক্ষয়কুমার, রবীন্দ্র-যুগের বাংলার শ্রেষ্ঠ বাঙালি ইতিহাসবিদ’। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তিন-দশক নিবিড় বন্ধুত্বে একে অপরের প্রতি গভীর অনুরাগী ও গুণমুগ্ধ হয়ে একসাথে গুণ করেছেন। সাহিত্যিক প্রবোধচন্দ্র সেন বলেন, ‘বঙ্কিম-নির্মিত ইতিহাস পথে যে সেনাপতি প্রথম আবিভর্‚ত হলেন, তিনিই অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়।’ (ইতিহাস তপস্বী-অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, দেশ, সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৭৩ বঙ্গাব্দ)। প্রবোধচন্দ্র অন্যত্র বলেন, ‘বাংলার ইতিহাস রচনার নবযুগ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে প্রথম সেনাপতির মর্যাদা অক্ষয়কুমারেরই প্রাপ্য।’ (বাংলার ইতিহাস-সাধনা, ১৩৬০ বঙ্গাব্দ, কলকাতা)। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের অমরসৃষ্টি—সিরাজদ্দৌলা ; বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম তাঁর অক্ষয়-গৌরব-কীর্তি। পাহাড়পুর মহাবিহার খননের তিনিই মহান স্থপতি। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় তখনকার বিখ্যাত ভারতী, সাহিত্য, প্রবাসী, সাধনা ইত্যাদি পত্রিকায় বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় অন্তত তিনশত প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ এবং বহু গ্রন্থ রচনা করে বাংলার ইতিহাসচর্চা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনকে জাগিয়ে তোলেন এবং নিজে প্রধান ইতিহাসবিদের খ্যাতি লাভ করেন। ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক ছাড়াও তিনি ছিলেন সাহিত্যিক, সম্পাদক, শিল্পরসিক, প্রযুক্তিবিদ, নাট্যশাস্ত্রবিদ, নাট্যকার, বাগ্মী, মরমীকবি, বাউলসাধক, জনপ্রতিনিধি, সমাজ-সংস্কারক এবং আরও বহুবিদ কাজের জনক। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ১৯৩০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি (২৭ মাঘ ১৩৩৬) রাজশাহী শহরে মৃত্যুবরণ করেন। আজ (১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩) তাঁর ৯৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। অক্ষয়কুমারের জন্ম ১৮৬১ সালের ১ মার্চ (১৯ ফাল্গুন ১২৬৭) তৎকালিন নদীয়ায়, বর্তমান কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে। পিতা মথুরানাথ মৈত্রেয়, মাতা সৌদামিনী দেবীর বড় সন্তান অক্ষয়কুমার। সাহিত্যসেবক গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ গ্রামবার্ত্তাপ্রবাশিকা পত্রিকার সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ও অক্ষয়কুমারের পিতা ইরেজির শিক্ষক মথুরানাথ মৈত্রেয় ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বন্ধুর অনুরোধে হরিনাথই মথুরানাথের শিশুপুত্রের নাম রেখে দেন।আত্মকথা’য় অক্ষয়কুমার বলেন, ‘এই বালক বাঙ্গালা সাহিত্যের যাহাতে উন্নতি করে, এইরূপ শিক্ষাই দিতে হইবে। এই উদ্দেশ্যে অক্ষয়কুমার দত্তের নাম স্মরণে আমার নামও অক্ষয়কুমার রাখা হয়। হরিনাথই আমার এই নামকরণ করেন এবং তিনিই আমার সাহিত্য পথের গুরু।’ (হরিমোহন মুখোপাধ্যায়, সম্পাদিত বঙ্গভাষার লেখক গ্রন্থে অক্ষয়কুমার প্রণীত আত্মকথা, বঙ্গভাষী কার্যালয়, কলকাতা, ১৯০৪ খ্রি.)। অক্ষয়কুমার, জলধর সেন ও শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব এই তিনবন্ধুর (পরবর্তীতে সকলেই বাংলার বিখ্যাত সাহিত্যিক) বাল্যশিক্ষার হাতে-খড়ি হয় কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের কুমারখালির বঙ্গ-বিদ্যালয়ে। শিক্ষাগুরু হরিনাথকেই এই তিন শিষ্য তাঁদের ‘সাহিত্য-ক্ষেত্রের পথি-প্রদর্শক’ করেছেন। কুমারখালিতে তখন বাউল সম্রাট লালন সাঁই, হরিনাথ মজুমদার, মীর মোশাররফ হোসেন প্রমুখের মধ্যে নিবিড় ঘনিষ্ঠতা তাঁরা গভীরভাবে অনুভব করেন এবং বাউলদর্শনে প্রভাবিত হন। ফকির লালন সাঁইয়ের পরমপ্রীতি লাভে ধন্য হয়েছেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। অক্ষয়কুমারের জীবনজুড়ে ছিল কাঙাল হরিনাথ মজুমদার—সেই সাথে লালন সাঁই। লালন-হরিনাথের আধ্যাত্ম জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়েছিলেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। কাঙাল হরিনাথের কুন্ডুপাড়ার ডেরায় লালন সাঁইয়ের সাথে অক্ষয়কুমারের পরিচয় ঘটে, ১৮৮০ সালে, অক্ষয়কুমারের বয়স তখন ঊনিশ—উদ্দীপ্ত সংস্কৃতিপ্রাণ তরুণ। হরিনাথের বাড়িতে অক্ষয়কুমারের সামনেই লালন সাঁই গান গেয়েছেন—গান বেঁধেছেনও—আবার অক্ষয়কুমারও মরমি গান সৃষ্টি করেছেন সেখানেই। লালন সাঁইয়ের গান শুনে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের মধ্যে প্রবল আধ্যাত্মচেতনা ও মরমীভাব জেগে ওঠে। সাঁইয়ের গানের প্রভাবে তৎক্ষণাৎ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের চিন্তায় আসে একটি বাউল দল গঠনের কথা। তখনই অক্ষয়কুমার রচনা করেন ‘ভাব মন দিবানিশি, অবিনাশি’ নামে এক বাউল গান—গানের ভণিতা দেন ‘ফিকিরচাঁদ’। সুর শেষে সকলে মিলে গানটি গেয়ে শুনানো হয় কাঙাল হরিনাথ মজুমদারকে—অক্ষয়কুমারের লেখা গান শুনে হরিনাথও মাতোয়ারা। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় প্রস্তাব করেন নতুন একটি বাউল দল গঠনের কথা। তাঁরই আজন্ম-সুহৃদ বাল্যসখা সাহিত্যিক জলধর সেনসহ সঙ্গীয়দের সমর্থনে ওই সময়েই ১২৮৭ বঙ্গাব্দের প্রথমার্ধে (১৮৮০ খ্রি.) কাঙাল হরিনাথ মজুমদার এক বাউল দল গঠন করেন। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ‘ভাব মন দিবানিশি, অবিনাশি’ গানে ভণিতা হিসেবে ‘ফিকিরচাঁদ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং এই নামেই বাউল দলের নাম রাখেন হরিনাথ মজুমদার। ফিকিরচাঁদ বাউল দলের জন্য প্রথম গান রচনা করে বাংলার বাউল-ইতিহাসে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় একজন বাউল হিসেবে সমাদৃত হন। বাংলায় এই দলের বিপুল খ্যাতি হয়।অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়কে সখের বাউল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সাহিত্যিক আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, ‘প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ই ফিকিরচাঁদের বাউলদল গঠনের নায়ক।’ (আবুল আহসান চৌধুরী, কুষ্টিয়ার বাউল সাধক, নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা, জানুয়ারি ১৯৭৪, দেখুন- অধ্যায় : ‘কতিপয় সখের বাউল’, পৃ.- ৩৬৫। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের পূর্বপুরুষের বাস ছিল রাজশাহীতে (গুড়নই গ্রাম বর্তমান নওগাঁ জেলার আত্রাই রেল স্টেশনের অদূরে অবস্থিত)—তাঁরা বরেন্দ্রের বিখ্যাত কুলীন ব্রাহ্মণ। অক্ষয়কুমারের পিতা সরকারি কর্মসূত্রে ১৮৭২ সালে রাজশাহীর জজকোর্টে যোগদানের মাধ্যমে রাজশাহীর মানুষ আবার রাজশাহীতে ফিরে আসেন—বসতি গড়েন মহানগীর ঘোড়ামারায়। অক্ষয়কুমারের শৈশবের দশ-বছর কাটে কুমারখালীতে, রাজশাহীর জীবন ছয় দশকের। তাঁর মৌলিক সব সৃষ্টি রাজশাহীতেই, কিন্তু এই সৃষ্টির পেছনে কুমারখালীর প্রভাব ও চেতনা জীবনভর বয়েছেন গৌরবের সাথে। ‘রাজশাহীতে যাহা কিছু অক্ষয়, তাহাতেই অক্ষয়কুমার ছিলেন’; —এমনই গুণ-খেতাবে ডেকেছেন শ্রীভবানীগোবিন্দ চৌধুরী। (অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, ভারতবর্ষ, বৈশাখ ১৩৩৭)। অক্ষয়কুমার ১৮৭৮ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা, ১৮৮০ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ, ১৮৮৩ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ, ১৮৮৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে বিএল পাশ করে এই বছরই আইনজীবী হিসেবে রাজশাহী কোর্টে যোগদান করেন। ১৯৩০ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী শহরে মৃত্যুবরণ অবধি অত্যন্ত সুনামের সাথে অক্ষয়কুমার এই পেশায় জড়িত ছিলেন। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের অক্ষয়কীর্তি বাংলার ইতিহাসচর্চার অন্যতম প্রধান পাদপীঠ বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম। অক্ষয়কুমারকে ‘সারথ্যে-বরণ’ করেই ১৯১০ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর নাটোর দিঘাপতিয়ার রাজপুত্র ও পরবর্তীতে নাটোর দয়ারামপুরের জমিদার কুমার শরৎকুমার রায় প্রতিষ্ঠা করেন বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি এবং এই সমিতিই পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করে এই মিউজিয়াম।বাংলাদেশের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক মিউজিয়াম ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এই মিউজিয়ামের দুই দশক প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ সংগ্রহ ও সঞ্চয় করে গেছেন সহযাত্রীদের সহযোগিতায় (বিশেষত ইতিহাসবিদ রমাপ্রসাদ চন্দ)। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়কে ‘বাংলাদেশে মিউজিয়াম ইতিহাসের পথিকৃৎ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন ড. এ বি এম হোসেন। (ইতিহাস ও শিল্পকলা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ, এ বি এম হোসেন, নভেল পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা, ২০০৬ খ্রি., পৃ.- ১১৩।)কুমার শরৎকুমার রায়ের সকল কাজের প্রধান সঞ্জীবনী শক্তি ছিলেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। কুমার শরৎকুমার রায়ের অর্থায়নে পাহাড়পুরের মহাবিহার (সোমপুর মহাবিহার) পাঁচ বছরের জন্য খনন শুরু ১৯২১ সালের ১ মার্চ। পাহাড়পুর মহাবিহার, নওগাঁর মাহিসন্তোষ, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর প্রত্নস্থলসহ বরেন্দ্রের বহু প্রত্নখননের অমর স্থপতি অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়।পাহাড়পুর মহাবিহার খনন করে অক্ষয়কুমারের ইতিহাস আবিষ্কার সম্পর্কে ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘...পুরাতাত্ত্বিক খননকার্য সমগ্র ভারতবর্ষে অক্ষয়কুমারই সর্বপ্রথম শুরু করেন এবং পথিকৃৎরূপে এটি অক্ষয়কুমারকে অপরিসীম মর্যাদার অধিকারী করেছে। অবহেলিত অপরিজ্ঞাত এই স্তূপপটি (পাহাড়পুর মহাবিহার) সর্বপ্রথম আকর্ষণ করেন তিনি এবং তাঁরই প্রচেষ্টার ফলে এই ধ্বংসস্তূপ থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ দেবমন্দির এবং বৌদ্ধবিহার যার অনিন্দ্যসুন্দর গঠন নৈপুণ্য।’ (Akshay Kumar Maitra, Ancient Monuments of Varendra (North Bengal), Edited by Kshitish Chandra Sarkar and Ramesh Chandra Majumdar, Varendra Research Society, Rajshahi, 1949, দ্র. রমেশচন্দ্র-কৃত Foreward)| মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীপাহাড়পুর খনন বিষয়ে বলেন, ‘বাঙ্গালী, তথা বাঙ্গলার গৌরব এই যে একজন বাঙ্গালী ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক স্থান খননকার্যে অগ্রসর হ’য়ে এসেছিলেন;—তিনি অক্ষয়কুমার। ...বাঙ্গলার পল্লী অঞ্চলের বৃক্ষলতার সমাচ্ছন্ন কন্টকাকীর্ণ শ্বাপদসঙ্কুল পরিত্যক্ত স্থানগুলির ঐতিহাসিক সম্ভাবনা নির্দ্ধারণের পুরোধা ও পথিকৃৎরূপে অক্ষয়কুমার যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তা সত্যই বিস্ময়কর।’ (মানসী, বৈশাখ ১৩২১)। অক্ষয়কুমারের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে, বঙ্গবিজয় (রচনা আনু. ১৮৭৬ খ্রি. ভিন্ন মতে ১৮৭৭ খ্রি.), সমরসিংহ (১৮৮৩ খ্রি.), সীতারাম রায় (১৮৯৮ খ্রি.), সিরাজদ্দৌলা (১৮৯৮ খ্রি.), Gauda, under the Hindus, (১৯০২ খ্রি.), মীরকাসিম (১৯০৬ খ্রি.), ময়না (নাটক, প্রকাশ- ১৯০৬ খ্রি.), গৌড়লেখমালা (১৯১২ খ্রি.), গৌড়রাজমালা (সম্পাদনা ১৯১২ খ্রি.), ফিরিঙ্গি বণিক (১৯২২ খ্রি.), অজ্ঞেয়বাদ (১৯২৮ খ্রি.), A short history of Natore Raj (১৯১২ খ্রি.)। অক্ষয়কুমারের মৃত্যুর পর প্রকাশিত গ্রন্থ, The Fall of Pala Empire’, ‘The Ancient Monuments of Varendra (North Bengal), রাণী ভবানী, গৌড়ের কথা, সাগরিকা, উত্তরবঙ্গের পুরাতত্ত্ব সংগ্রহ, ভারত-শিল্পের কথা, আবাহন (নাটক), অক্ষয়কুমারের রচনা সংগ্রহ। অক্ষয়কুমারের পাণ্ডিত্যপূর্ণ সম্পাদনায় রমাপ্রসাদ চন্দ প্রণীত ‘গৌড়রাজমালা’ আধুনিক-বিজ্ঞান-সম্মত প্রণালীতে লিখিত বাংলার প্রথম ইতিহাস’ হিসেবে ইতিহাসবিদ কর্তৃক স্বীকৃত। মূলত, ‘ইতিহাসের পাথুরে প্রমান’ খ্যাত শিলালিপি ও তাম্রলিপির ভিত্তিতে ১৯১২ সালে বরেন্দ্র-অনুন্ধান-সমিতি থেকে প্রকাশিত গৌড়রাজমালা ও গৌড়লেখমালা সমিতির প্রতিষ্ঠাতা কুমার শরৎকুমার রায়ের অর্থায়নে প্রকাশের মাধ্যমে বাংলার ইতিহাসের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ইতিহাসচর্চার সূচনা হয়।‘সিরাজদ্দৌলা’ রচনা করে অক্ষয়কুমার সত্য-নির্ভর ইতিহাস নির্মাণের পথিকৃৎ হয়েছেন। অক্ষয়কুমার সিরাদ্দৌলা গ্রন্থে বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলাকে অন্ধকারের কালিমামুক্ত করেন; বাঙালির প্রকৃত ইতিহাস উদ্ধার করেন। নবাব সিরাজদ্দৌলা একজন খাঁটি বাঙালি এবং ভারতভূমির পবিত্র-সন্তান ও বিরল দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের সিরাজদ্দৌলা প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ভারতী পত্রিকায় ‘সিরাজদ্দৌলা’ শীর্ষক সুদীর্ঘ রচনা প্রকাশ করে বন্ধুপ্রতীম ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমারকে সমর্থন জানান। কবিগুরু অকুণ্ঠচিত্তে বলেন, ‘বাঙ্গালা ইতিহাসে তিনি (অক্ষয়কুমার) যে স্বাধীনতার যুগ প্রবর্ত্তন করিয়াছেন সেজন্য তিনি বঙ্গসাহিত্যে ধন্য হইয়া থাকিবেন’ এবং ‘যিনি আমাদিগকে অন্ধ অনুবৃত্তি হইতে মুক্তিলাভের দৃষ্টান্ত দেখাইতে পারিয়াছেন, তিনি আমাদের দেশের লোকের কৃতজ্ঞতাপাত্র।’ (ভারতী, শ্রাবণ ১৩০৫)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহযোগিতা ও পরামর্শে অক্ষয়কুমার ১৮৯৯ সালে ৫ জানুয়ারি রাজশাহী মহানগরীর ঘোড়ামারার নিজ বাসভবন (অক্ষয় নিকেতন) থেকে প্রকাশ করেন ইতিহাসভিত্তিক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘ঐতিহাসিক চিত্র’। অক্ষয়কুমারের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঐতিহাসিক চিত্রের প্রথম সংখ্যায় ‘সূচন’ নামে ভূমিকা লিখে দেন। ঐতিহাসিক চিত্র বাংলার প্রথম ইতিহাসভিত্তিক পত্রিকা। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের ইতিহাস-সাধনা ও সমাজহিতৈষীপনায় মুগ্ধ হয়েছে দেশ-বিদেশের বহু পণ্ডিত ও প্রতিষ্ঠান। অক্ষয়কুমারের প্রতিভা ও সৃষ্টিতে অনুরাগ ও অভিমত প্রকাশ করেছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বিশ্বখ্যাত ইতিহাসবিদ ভি ভি স্মিথ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি নজরুল ইসলামসহ বহু বিখ্যাত মানুষ।বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎসহ বহু প্রতিষ্ঠানের তিনি নেতৃস্থানীয় ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামসহ বিভিন্ন সাহিত্য ও ইতিহাস সম্মেলনে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানে অক্ষয়কুমার স্মারক বক্তৃতা করেন। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়কে নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিমত সবচেয়ে বেশি সমাদৃত হয়েছে পণ্ডিত মহলে। বাংলার শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ হিসেবে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়কে সগৌরবে স্বীকৃত করেছেন—বিভিন্ন লেখা ও পত্রে নানা অভিধায় ভূষিত করেছেন। ‘তিনি (অক্ষয়কুমার) আধুনিক বাঙ্গালী ইতিহাস-লেখকগণের শীর্ষ-স্থানীয়’ বলেও কবিগুরু স্বীকৃত করেন। (ঐতিহাসিক যৎকিঞ্চিৎ, ভারতী, আষাঢ় ১৩০৫)। বন্ধুপ্রতিম ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের ইতিহাসসাধনায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমনই অনুরাগী হয়ে পড়েন যে, শান্তিনিকেতন বোলপুর হতে ১৬ ভাদ্র ১৩০৯ তারিখে এক পত্র লিখে শুধু বাংলা নয় ত্রিশকোটি ভারতবাসীরই ইতিহাস লেখার দায়িত্ব গ্রহণ করতে নিজের আকুতি জানান। কবিগুরু পত্রে বলেন, —‘আপনি ওকালতিটা ছাড়ুন। চুপচাপ বসিয়া পড়ুন। মাঠের কোণে আসিয়া কুটীর বাঁধুন। তারপরে হবিষ্যান্ন খাইয়া খাগড়ার কলম ধরিয়া তালপাতে ভারতবর্ষের ইতিহাসকথা লিপিবদ্ধ করুন, ত্রিশকোটি নরনারীর আশীর্বাদভাজন হইবেন।’ (বিশ্বভারতী পত্রিকা, মাঘ-চৈত্র ১৩৬৮, কলকাতা)। লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। |