
| Headline : |
|
উদ্যোক্তার সন্ধানে
লালপুরের খাঁটি খেজুরের রস ও গুড় সারাদেশে বিরাট চাহিদা
।হিমু আহমেদ।
|
|
দৈনিক শিক্ষাতথ্য, ঢাকা (০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২) :-
শীত মৌসুমে নাটোরের লালপুর এলাকাটি মৌ মৌ করে মিষ্টি মধুর সুগন্ধে। সেই সুগন্ধটি হচ্ছে খাঁটি খেজুরের রসের মত্ত মাতাল গন্ধ। যখন খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয় তখনই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে সেই মিষ্টি মধুর সুগন্ধ। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক শিক্ষাতথ্য’ পত্রিকার সম্পাদক এবং আমার সাংবাদিক বন্ধু তছলিম উদ্দিন-এর বাড়ি হচ্ছে সেই খেজুরের রস সমুদ্রের কেন্দ্রবিন্দুতে। পত্রিকার কাজে তছলিম উদ্দিন ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন দিনাজপুর, সেখান থেকে চলে এলেন কুষ্টিয়াতে। আমিও ঠিক একই সময়ে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া গিয়েছিলাম উদ্যোক্তার সন্ধানে। সেই সুবাদে তছলিম উদ্দিন আমাকে নিয়ে গেলেন তার গ্রামের বাড়িতে। উদ্দেশ্য খাঁটি খেজুরের রস এবং খাঁটি খেজুরের গুড় সারাদেশে সরবরাহ করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায় কি না তার সম্ভাব্যতা যাচাই করা। আমরা কুষ্টিয়ার কাজ সেরে মধুমতি ট্রেনযোগে ঈশ্বরদী স্টেশনে নামলাম রাত সাড়ে আটটায়। সেখান থেকে অটো করে লালপুর এবং লালপুর থেকে সিএনজি করে সালামপুর পৌঁছালাম। সালামপুর থেকে তছলিম উদ্দিন-এর লক্ষ্মণবাড়িয়ার বাড়িতে যখন পৌঁছলাম তখন রাত এগারোটা বেজে গেছে। ততক্ষণে প্রচণ্ড ঠান্ডায় আমরা দু’জনই কাঁপছি। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমাতে ঘুমাতে রাত বারোটা বেজে গেল। পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি তছলিম উদ্দিন-এর মেজো ভাই আবু বকর সিদ্দিক সাহেব আমাদের জন্য খেজুরের খাঁটি রস নিয়ে হাজির। খেজুরের সেই রসে একটি চুমু দেয়ার সাথে সাথেই আমি শিহরিত হয়ে উঠলাম। আমার কাছে মনে হলো- আমি যেন অমৃত পান করছি। মধুর চেয়েও মিষ্টি কথাটি আমরা বিভিন্ন উপমার ক্ষেত্রে ব্যবহার করি। কিন্তু এ রস এতটাই মিষ্টি যে তা ভাষায় প্রকাশ করা এক কথায় অসম্ভব ব্যাপার। নিঃসন্দেহে যে এ রস একবার পান করেছে, সেই একমাত্র উপলব্ধি করতে পারবে এই খেজুরের রসটা কতটুকু মিষ্টি। নাটোরের খেজুরের গুড় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রতিদিনই চলছে হাজার হাজার মন গুড় কেনাবেচার অবিরাম কর্মকান্ড। এই গুড় দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের পিঠা। তাই চাহিদা তুঙ্গে। উৎপাদিত গুড় বিক্রির জন্য নাটোর জেলায় প্রতিদিনই বসে হাট। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- লালপুর, নাটোর সদর ও সিংড়া হাট। সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার বনপাড়া বাজারে গুড় বিক্রির হাট বসে। প্রতি হাটে ১০ থেকে ১৫ ট্রাক গুড় কেনেন ব্যবসায়ীরা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যাপারীরা নিয়ে আসেন এ হাটে। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত প্রতিদিনই লালপুরে বসে গুড়ের হাট। এলাকার হাজার হাজার গুড় তৈরিকারক তাদের গুড় নিয়ে এ বাজারে আসেন। বর্তমানে খেজুরের গুড় ৮০ থেকে ৮২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু জানা গেছে- উদ্যোক্তার সাথে আলাপ করে জানা গেছে যে, প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে যে সব খেজুরের গুড় সারা দেশে চলে যাচ্ছে তা চিনি মিশ্রিত। তিনি আরো জানান যে, নির্ভেজাল ও খাঁটি খেজুড়ের গুড় সরবরাহের প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বিশেষ তদারকী ও তত্ত্বাবধানে আসল ও খাঁটি খেজুরের গুড় সরবরাহ করছেন।তবে এক হিসেবে দেখা গেছে, লালপুর, বনপাড়া, সিংড়া ছাড়াও নাটোর শহরের স্টেশন বাজারের আড়ত থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় যায় খেজুরের গুড়। এতে প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ ট্রাক গুড় কেনাবেচা হয়। প্রতি ট্রাক গুড়ের মূল্য ১০ লাখ টাকা হিসাবে দিনে প্রায় ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার ব্যবসা হয়। আবুবকর সিদ্দিক সাহেব জানালেন, ১৫০টি গাছের রস দিয়ে একদিনে ৬০-৭০ কেজি গুড় তৈরি করা যায়। এলাকায় শত শত গাছি রয়েছে। ওই গাছিরাও খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরি ও বিক্রি করে সংসার চালান। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রতিদিনই কেনাবেচা হচ্ছে খেজুরের গুড়। বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যাপারীরা আসছেন গুড় কিনতে। নাটোরে কতজন গুড় তৈরির সঙ্গে যুক্ত কিংবা প্রতিদিন কত টাকার গুড় বেচাকেনা হয় তার সঠিক হিসাব জানা নেই। তবে প্রতিদিনই ট্রাক ভর্তি গুড় যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। এতে নাটোরে লাখ লাখ টাকার ব্যবসা চলছে এই গুড় বেচাকেনায়। তছলিম উদ্দিন-এর বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যখন রওনা হলাম তখন দেখতে পেলাম রাস্তার দু’পাশে বিভিন্ন বাড়িতে খেজুরের রস দিয়ে খেজুরের গুড় তৈরি করা হচ্ছে। খেজুরের গুড়ের সেই মৌ মৌ গন্ধ রাস্তার দুইপাশ থেকে সবার নাকে এসে ধাক্কা মারছিল। আমার মনে হলো আমি যেন গন্ধ শুঁকেই খাঁটি খেজুরের গুড়ের অর্ধভোজন করে ফেলেছি। সারা দেশে এই খেজুরের রস এবং খেজুরের গুড় যদি প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দেয়া যায় তাহলে দেশের আপামর জনগণ খাঁটি খেজুরের রস এবং খেজুরের গুড়ের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবেন। এজন্য নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার কি এসব উদ্যোক্তাদের সাহায্য করবে যারা দেশে এরকম বিভিন্ন প্রোডাক্ট স্বল্প মূল্যে সরবরাহ করতে সক্ষম হবেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সাহায্য করার জন্য একটি ঋণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। জানা গেছে সফল উদ্যোক্তাগণ বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। আমার মনে হয় যদি সফল উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সরকার যদি সহজ শর্তে এরকম ঋণের ব্যবস্থা দিতে সক্ষম হন তাহলে তারাও সারাদেশে এরকম উন্নত পণ্য স্বল্প খরচে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবেন। উদ্যোক্তাদের সহায়তা করলে দ্রুত দেশে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে এবং সারা বিশ্বে বাংলাদেশ আবারো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। - হিমু আহমেদ himuahmed964011@gmail.com |