
| Headline : |
|
ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলার ইতিহাসচর্চার জনক : ১৫৯তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি
ইতিহাসচর্চার জনক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়’র আজ ১৫৯তম শুভ জন্মদিন
লেখক : মো. সফিকুল ইসলাম, উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
|
|
শিক্ষাতথ্য, ঢাকা (০১ মার্চ)
:-
![]() ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলার ইতিহাসচর্চার জনক : ১৫৯তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি বাংলাদেশ তথা রাজশাহীর যে ক’জন কৃতি সন্তান তাঁদের কর্ম প্রতিভা ও পাণ্ডিত্যে দিয়ে সমগ্র বাংলা, ভারতবর্ষ, এমনকি বিশ্বব্যাপি নন্দিত হয়েছেন তাঁদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। কবিগুরু বরীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে বাঙালি লেখকগণের শীর্ষস্থানীয় এবং যুগপ্রবর্তক ইতিহাসবিদ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলার ইতিহাসের প্রাণপুরুষ। বাংলাভাষায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাঙালি জাতির ইতিহাসচর্চার তিনিই পথিকৃৎ। বলা যেতে পারে বাংলার ইতিহাসচর্চার জনক। কর্ম-প্রতিভা, পাণ্ডিত্যে ও মনীষায় তিনি বাঙালি জাতির অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ সন্তান। বাংলার ইতিহাসচর্চার মহান সাধক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়-এর আজ ১ মার্চ ১৫৯তম জন্মদিন। কবিগুরু বরীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে অতিশয় ভক্তি-শ্রদ্ধা ও মান্য করতেন। উভয়ে বাংলার ইতিহাস নিয়ে কাজও করেছেন একসাথে। অক্ষয়কুমারের অক্ষয়কীর্তি বাংলার ইতিহাসচর্চার প্রধান পাদপীঠ বিশ্বখ্যাত রাজশাহীর বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম। তিনি এই মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন। রাজশাহীতে যাহা কিছু অক্ষয়, তাহাতেই অক্ষয়কুমার ছিলেন- শ্রী ভবানীগোবিন্দ চৌধুরী এমনই খেতাবে উপাধিতে ভূষিত করেছেন তাঁকে। তিনি ৬১ বছর রাজশাহীর মাটিতে বসবাস করে বহুমাত্রিক কাজ করে গেছেন। অক্ষয়কুমার যেমন ছিলেন রাজশাহীর প্রাণ, তেমনি রাজশাহী ছিল তাঁর প্রাণেরও অধিক। যতদিন তাঁর দেহে প্রাণ ছিল ততদিন তিনি মাতৃভূমির ইতিহাস উদ্ধার ও রচনায় নিজকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের জন্ম ১৮৬১ সালের ১ মার্চ শুক্রবার অপরাহ্নে, তৎকালীন নদীয়া (বর্তমান কুষ্টিয়া) জেলার নওয়াপাড়া থানার গৌড়ীর নদীর তীরবর্তী সিমলা গ্রামে মাতার মাতুলালয় ভগবানচন্দ্র মজুমদারের বাড়িতে। শৈশবের প্রায় এক দশক সেখানেই কাটে। গ্রামীন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ গ্রামবার্তা প্রকাশিকার সম্পাদক হরিনাথ মজুমদারের (কাঙাল হরিনাথ) কাছে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। অক্ষয়কুমারের পরিবারের পূর্বপুরুষের বাস ছিল রাজশাহীতেই। পরে তাঁরা অন্যত্র বসতি গড়েন, আবার ফিরে আসেন রাজশাহীতে। সে-কথাও পাওয়া যায় তাঁর নিজের জবানীতেই। অক্ষয়কুমারের ভাষায়, আমরা রাজসাহীর (রাজশাহী বানানে তখন ‘স’ ব্যবহার হতো) অন্তর্গত গুড়নই (বর্তমান নওগাঁর আত্রাই) গ্রামের মৈত্রেয় বংশ। রাজশাহীতেই শিক্ষা লাভ, বসতি গড়া, বেড়ে ওঠা, ওকালতি, বিয়ে-সাদী-সংসার, সাহিত্যকর্ম, বাংলার ইতিহাস রচনা, ঐতিহাসিক হওয়া, কবিগুরুর ও বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা কুমার শরৎকুমার রায়ের রায়ের সাথে নিবিড় বন্ধুত্বে কাজ করা, প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ, রেশম স্কুল প্রতিষ্ঠা, নাট্যচর্চা, ক্রিকেটার, চিত্রকর, শিক্ষা-সাহিত্য-ইতিহাস-সাংস্কৃতিক কর্মে নেতৃত্ব, রাজশাহী মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার, লোকাল বোর্ড ও ডিষ্ট্রিক বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী, রাজশাহী এসোসিয়েশনের সম্পাদক এবং সর্বোপরি বাংলার ইতিহাস চর্চার পথিকৃৎ বা জনকের খ্যাতিলাভের গৌরব এই মাটিতেই পেয়েছেন। মৃত্যুর পর শেষকৃত্য হয় রাজশাহীতেই। বাংলার এই অমর সন্তানের দেহভস্ম এই পদ্মাতেই বিলীন হয়েছে। ১৮৭১ সালে রাজশাহী বোয়ালিয়া গবর্নমেন্ট স্কুলে (বর্তমান কলেজিয়েট স্কুল) ইংরেজি শিক্ষা এবং ১৮৭৪ সালে সংস্কৃত শিক্ষা শুরু করেন। বাংলা, ইংরেজি, পালি সংস্কৃত, ফারসীসহ বিভিন্ন ভাষায় অসাধারণ পাণ্ডিত্যে অর্জন করেন। ১৮৭৮ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় রাজশাহী বিভাগের মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৮৮০ সালে রাজশাহী কলেজ হতে এফএ পাশ করেন। রাজশাহী বিভাগের মধ্যে এই পরীক্ষাতেও প্রথম হন। এই সময়ে পাবনার প্রসিদ্ধ জমিদার অন্নদা গোবিন্দ চৌধুরীর তৃতীয় কন্যা হৃদকমল দেবীর সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর ১৮৮৩ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন এবং ওই কলেজ থেকে রসায়ন ও বিজ্ঞান শাস্ত্রে এমএ পরীক্ষা দেয়ার জন্য পাঠ সমাপ্ত করেন। কিন্তু অতিরিক্ত অধ্যয়ন-শ্রমে হঠাৎ অসুস্থ পড়েন। পিতার আগ্রহে পরীক্ষা না দিয়েই রাজশাহী ফিরে এসে ১৮৮৫ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে বিএল পাশ করেন এবং ওই বছরই আইনজীবী হিসেবে রাজশাহী কোর্টে যোগদান করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সাথে অক্ষয়কুমার এই পেশায় জড়িত ছিলেন। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় কৌশরেই ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাসের প্রতি গভীর অনুরাগী হয়ে ওঠেছিলেন পরিবার থেকে শিক্ষা পেয়ে। বাল্যকালেই স্কুলে পড়া-অবস্থায় তাঁর লেখার হাতেখড়ি হয়। বাল্যরচনা বা প্রাথমিক রচনা ছাপা হয় গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার সম্পাদিত কুমারখালী থেকে প্রকাশিত ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ ও রাজশাহীর ‘হিন্দুরঞ্জিকা’ পত্রিকায়। ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র সম্পাদনার মাধ্যমে তাঁর সম্পাদনারও হাতেখড়ি হয়। ইতিহাস অনুসন্ধানে অক্ষয়কুমারের উৎসাহের অন্ত ছিল না। প্রাচীন প্রত্ন-উপাদান ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইতিহাসের স্বরূপ উদ্ঘাটন ও সেজন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ ছিল তাঁর আগ্রহের বিষয়। ১৮৯৯ সালে তিনি রাজশাহী থেকে প্রকাশ করেন ইতিহাসভিত্তিক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘ঐতিহাসিক চিত্র’। বাংলাভাষায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে এটিই প্রথম ইতিহাসভিত্তিক পত্রিকা হিসেবে তখনকার পণ্ডিত মহলে স্বীকৃতি লাভ করে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকা প্রকাশের পরামর্শদাতা ও সহযোগী ছিলেন এবং তিনিই উদ্বোধনী সংখ্যার ‘সূচনা’ নিজ নামে লিখে দেন। ঐতিহাসিক রচনার জন্যই অক্ষয়কুমার প্রখ্যাত এবং এ জন্যই বিদ্বৎসমাজে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘সিরাজউদ্দৌল্লা’ (১৮৯৮ খ্রি.), ‘মীরকাসিম’ (১৯০৬ খ্রি.), ‘গৌড়লেখমালা’ (১৯১২ খ্রি.), রমাপ্রসাদ চন্দ প্রণীত ‘গৌড়রাজমালা’ সম্পাদনা (১৯১২ খ্রি.), ‘সমরসিংহ’ (১৮৮৩ খ্রি.), ‘সীতারাম রায়’ (১৮৯৮ খ্রি.), ‘অজ্ঞেয়-বাদ’ (১৯২৮ খ্রি.), A short history of Natore Raj. (১৯১২)’ ইত্যাদি। তখনকার বাংলা ও ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ পত্রিকায় অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ইতিহাস, সাহিত্য ও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অবিচ্ছিন্নভাবে লিখে জাগরণ তৈরি করেন এবং নিজে প্রধান লেখক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। সিরাজদ্দৌল্লা প্রকাশ হলে ইতিহাসবিদ হিসেবে সারা বাংলাজুড়ে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। অক্ষয়কুমারের লেখনির কারণেই নবাব সিরাজদ্দৌল্লা বাঙালির প্রাণের নবাবে পরিণত হয়। অক্ষকুমারের আরও বহু রচনা ও বক্তৃতায় বাঙালি চেতনা জাগরিত হয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন বেগবান হয়। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় কীর্তিমান বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বির্নিমাণে আজীবন নিবেদিত ছিলেন। তাঁর ইতিহাসবোধ ও ইতিহাসচর্চা জাতির কলঙ্কমোচনে গৌরবময় অবদান অনস্বীকার্য। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের জীবনের বড় সম্মাননা হচ্ছে সর্ববাংলার মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা। তবে, প্রাতিষ্ঠানিক সম্মাননাও তিনি বেশ পেয়েছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ‘কায়সার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদক (১৯১৫), সি আই ই (১৯২০)। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে ১৯৩০ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি ৭০ বছর বয়সে প্রয়াত হন। তাঁকে হারিয়ে গোটা বাংলাসহ ভারতবর্ষ বিশেষত বাঙালি-সমাজ শোককাতর হয়ে পড়ে। বাংলার ঘরে ঘরে মানুষের নিরব কান্না। সংবাদপত্রে প্রকাশ হতে থাকে সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কবিতাসহ নানা লেখা। শ্রীভোলানাথ মজুমদার গভীর অনুভবে লিখেন শোকগাথা কবিতা। কবিতার নাম ‘মৈত্রেয়-বিয়োগে’। কবিতাটি কোলকাতার বিখ্যাত পত্রিকা ‘ভারতবর্ষ’ বৈশাখ ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের সংখ্যায় ছাপা হয়। ভোলানাথ মজুমদার তাঁর এই কবিতায় অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের পরিপূর্ণ সৃষ্টিকর্ম প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন। অমর সেই কবিতার দুই লাইন নিচে উল্লেখ হলো, - ‘ধন্য অক্ষয় ! অক্ষয় অমর বঙ্গবাণীর ধীমান হোতা, /বাঙলার তুমি, তুমি ভারতের, বিশ্ব তোমার বাণীর শ্রোতা।’ |